মাইটোসিস কোষ বিভাজনের গুরুত্ব: ৭টি মূল পয়েন্ট, ধাপ ও প্রশ্নোত্তর

    মাইটোসিস কোষ বিভাজন হলো সেই প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে একটি মাতৃকোষ ভাগ হয়ে হুবহু একই রকম দুটি অপত্য কোষ তৈরি করে। আমাদের দেহ বেড়ে ওঠা থেকে শুরু করে কেটে যাওয়া জায়গা শুকানো পর্যন্ত প্রায় সবকিছুর পেছনেই এই বিভাজন কাজ করে। এই পোস্টে মাইটোসিস কোষ বিভাজনের গুরুত্ব, এর ধাপসমূহ এবং পরীক্ষায় আসার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর সহজ ভাষায় সাজানো হয়েছে।

    মাইটোসিস কোষ বিভাজন কী?

    যে কোষ বিভাজনে মাতৃকোষের নিউক্লিয়াস একবার বিভাজিত হয়ে সমান সংখ্যক ক্রোমোজোমবিশিষ্ট দুটি অপত্য নিউক্লিয়াস তৈরি করে, তাকে মাইটোসিস কোষ বিভাজন বলে। এই বিভাজনে অপত্য কোষের ক্রোমোজোম সংখ্যা, গঠন ও গুণাবলি মাতৃকোষের মতোই থাকে। তাই একে সমীকরণিক বিভাজনও বলা হয়। মাইটোসিস সাধারণত জীবের দেহকোষে (সোমাটিক কোষে) ঘটে।

    মাইটোসিস কোষ বিভাজনে দুটি প্রধান অংশ থাকে। প্রথমে নিউক্লিয়াসের বিভাজন, যাকে ক্যারিওকাইনেসিস বলে। এরপর সাইটোপ্লাজমের বিভাজন, যাকে সাইটোকাইনেসিস বলে।

    মাইটোসিস কোষ বিভাজনের গুরুত্ব

    জীবের জীবনে মাইটোসিস কোষ বিভাজনের গুরুত্ব অনেক। নিচে প্রধান ৭টি গুরুত্ব তুলে ধরা হলো:

    ১. দেহ গঠন ও দৈহিক বৃদ্ধি

    বহুকোষী জীবের দেহ গঠন ও দৈহিক বৃদ্ধি ঘটে মাইটোসিস কোষ বিভাজনের মাধ্যমে। একটিমাত্র কোষ (জাইগোট) বারবার মাইটোসিস বিভাজনের মাধ্যমে কোটি কোটি কোষে পরিণত হয় এবং পূর্ণাঙ্গ দেহ তৈরি করে।

    ২. জনন অঙ্গ সৃষ্টি

    জীবের জনন অঙ্গ সৃষ্টি হয় মাইটোসিস কোষ বিভাজনের দ্বারা। এছাড়া অনেক উদ্ভিদের অঙ্গজ প্রজননও এই বিভাজনের মাধ্যমেই ঘটে।

    ৩. ক্রোমোজোমের সমতা রক্ষা

    মাইটোসিস কোষ বিভাজন জীবকোষে ক্রোমোজোমের সমতা রক্ষা করে। ফলে প্রতিটি নতুন কোষে মাতৃকোষের সমান সংখ্যক ক্রোমোজোম থাকে এবং জীবের বৈশিষ্ট্য অপরিবর্তিত থাকে।

    ৪. ক্ষতস্থান পূরণ

    বহুকোষী জীবের দেহে সৃষ্ট যেকোনো ক্ষতস্থান মাইটোসিস কোষ বিভাজনের মাধ্যমে পূরণ হয়। হাত কেটে গেলে কয়েকদিন পর যে নতুন চামড়া গজায়, তা এই বিভাজনেরই ফল।

    ৫. কোষের নির্দিষ্ট আকার ও আয়তন রক্ষা

    এই বিভাজনে সৃষ্ট অপত্য কোষ মাতৃকোষের মতো গুণসম্পন্ন হয়। তাই প্রতিটি কোষের নির্দিষ্ট আকার ও আয়তন বজায় থাকে এবং নিউক্লিয়াস ও সাইটোপ্লাজমের ভারসাম্য ঠিক থাকে।

    ৬. ক্ষয়প্রাপ্ত কোষের প্রতিস্থাপন

    জীবদেহে কিছু কোষের আয়ুষ্কাল কম, যেমন লোহিত রক্তকণিকা ও ত্বকের কোষ। এসব কোষ নষ্ট হলে মাইটোসিস কোষ বিভাজন প্রক্রিয়ায় ক্রমাগত নতুন কোষ তৈরি হয়ে ক্ষয় পূরণ হয়।

    ৭. অনিয়ন্ত্রিত মাইটোসিস ও ক্যান্সার

    মাইটোসিস নিয়ন্ত্রণ হারালে কোষ অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে, যা টিউমার এমনকি ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে। যেমন, হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের E6 ও E7 নামের দুটি জিন মাইটোসিস কোষ বিভাজনের নিয়ন্ত্রণ নষ্ট করে দিয়ে টিউমার বা ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে। তাই স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রিত মাইটোসিস জীবের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

    মাইটোসিস কোষ বিভাজনের ধাপসমূহ

    ক্যারিওকাইনেসিস বা নিউক্লিয়াসের বিভাজনকে বোঝার সুবিধার জন্য পাঁচটি ধাপে ভাগ করা হয়:

    1. প্রোফেজ: ক্রোমোজোমগুলো কুণ্ডলিত হয়ে খাটো ও মোটা হতে থাকে এবং প্রতিটি ক্রোমোজোম দুটি ক্রোমাটিডে বিভক্ত দেখা যায়।
    2. প্রো-মেটাফেজ: নিউক্লিয়ার পর্দা ও নিউক্লিওলাস বিলুপ্ত হয় এবং স্পিন্ডল যন্ত্র তৈরি হয়।
    3. মেটাফেজ: ক্রোমোজোমগুলো স্পিন্ডল যন্ত্রের বিষুবীয় অঞ্চলে সারিবদ্ধভাবে অবস্থান করে। এ সময় ক্রোমোজোম সবচেয়ে স্পষ্ট দেখা যায়।
    4. অ্যানাফেজ: প্রতিটি ক্রোমোজোমের ক্রোমাটিড দুটি আলাদা হয়ে বিপরীত মেরুর দিকে সরে যায়।
    5. টেলোফেজ: দুই মেরুতে আবার নিউক্লিয়ার পর্দা ও নিউক্লিওলাস তৈরি হয় এবং দুটি অপত্য নিউক্লিয়াস গঠিত হয়।

    এরপর সাইটোকাইনেসিসের মাধ্যমে সাইটোপ্লাজম ভাগ হয়ে দুটি সম্পূর্ণ অপত্য কোষ তৈরি হয়। নিচের ভিডিওতে বিষয়টি আরও সহজে বুঝতে পারবেন:

    মাইটোসিস ও মিয়োসিসের পার্থক্য

    • মাইটোসিস দেহকোষে ঘটে, আর মিয়োসিস ঘটে জননকোষ তৈরির সময়।
    • মাইটোসিসে একটি কোষ থেকে দুটি কোষ হয়, মিয়োসিসে হয় চারটি।
    • মাইটোসিসে ক্রোমোজোম সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকে, মিয়োসিসে তা অর্ধেক হয়ে যায়।

    মাইটোসিস কোষ বিভাজন: সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর

    মাইটোসিসকে সমীকরণিক বিভাজন বলা হয় কেন?

    কারণ এই বিভাজনে অপত্য কোষের ক্রোমোজোম সংখ্যা মাতৃকোষের সমান থাকে।

    মাইটোসিস কোষ বিভাজন কোথায় ঘটে?

    মাইটোসিস সাধারণত দেহকোষে ঘটে, বিশেষ করে উদ্ভিদের বর্ধিষ্ণু অঞ্চলে (যেমন কাণ্ড ও মূলের অগ্রভাগ) এবং প্রাণীর ভ্রূণ ও ত্বকের কোষে।

    মাইটোসিসের কোন ধাপে ক্রোমোজোম সবচেয়ে স্পষ্ট দেখা যায়?

    মেটাফেজ ধাপে ক্রোমোজোম সবচেয়ে স্পষ্ট দেখা যায়।

    শেষ কথা

    সংক্ষেপে বলা যায়, মাইটোসিস কোষ বিভাজন ছাড়া জীবের বৃদ্ধি, ক্ষয়পূরণ কিংবা বংশধারা ঠিক রাখা সম্ভব নয়। অষ্টম শ্রেণি থেকে শুরু করে এসএসসি পর্যন্ত এই বিষয় থেকে প্রায় নিয়মিত প্রশ্ন আসে। তাই মাইটোসিস কোষ বিভাজনের গুরুত্ব আর এর পাঁচটি ধাপ ভালোভাবে মনে রাখলে পরীক্ষায় সহজেই পুরো নম্বর পাওয়া যায়।

    আরও পড়ুন

    আরও জানতে দেখুন Mitosis – Wikipedia।

    Rabaya Bashri: Rabaya Bashri is a Lecturer with 14 years of teaching experience in biological science. Just after complete her M.Sc (Botany) she joined teaching profession. Having First Class all through her educational life she never seek for other job. She served most renowned school and colleges in Dhaka and Narayangonj city.

    View Comments (2)